ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পার্টি আয়োজিত মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

 

 

প্রেস বিজ্ঞপ্তি
০১ জানুয়ারী, ২০১৫ :
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি  হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, বিএনপি নেত্রী ইতিহাসের ফল ভোগ করছেন। তিনি (খালেদা জিয়া) এ দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করেছিলেন। আমাকে, আমার স্ত্রী-সন্তানকে অন্যায়ভাবে জেলে পাঠিয়েছিলেন। তখন মাসে একবার স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে পারতাম। কিন্তু এখন খালেদা জিয়ার দুই ছেলে দুই জায়গায়। কতদিন দেখা হয়নি, তার কোনো হিসাব নেই। আবার কবে দেখা হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। ইতিহাস কাউকে ছাড় দেয় না। খালেদা জিয়াকেও ইতিহাস ছাড় দেয়নি। তিনি সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আগামী নির্বাচনের রূপরেখা তৈরি করতে সব দলকে এক হয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ঐক্য ছাড়া জাতির মুক্তি নেই। এভাবে দেশ চলতে পারে না। আসুন সবাই বসি আগামীতে কিভাবে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায় সে ব্যাপারে আলোচনা করি। হরতাল-অবরোধ-জ্বালাও-পোড়াওসহ ধ্বংসাÍক রাজনীতি পরিহার করি। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করি। শান্তি সুখের বাংলাদেশ গড়ি।


বৃহস্পতিবার ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পার্টি আয়োজিত মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এসব কথা বলেন। মহাসমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ এমপি। সভাপতিত্ব করেন সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু এমপি। মহাসমাবেশে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বক্তৃতা করেন- প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মহিলা পার্টির সভানেত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এসএম ফয়সল চিশতী, এমএ হান্নান, অ্যাডভোকেট শেখ সিরাজুল ইসলাম, সাইদুর রহমান টেপা ও হাজী সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন।

মহাসমাবেশ থেকে প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তন, নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্তশাসন, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার, আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিধান করাসহ ১৮ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন এরশাদ। তিনি বলেন, আঠারো দফা কর্মসূচি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এই আঠারো দফা সামনে রেখেই আগামীতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাব। ক্ষমতায় গিয়ে শান্তি সুখের বাংলাদেশ উপহার দেব। নতুন বাংলাদেশ গড়ব। খুন-গুম-অপহরণ-টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি চিরতরে বন্ধ করব।

লাখো জনতার বিশাল মহাসমাবেশে এরশাদ বলেন, আমার ১৪২টি সমাবেশে তিনি (খালেদা জিয়া) ১৪৪ ধারা জারি করেছিলেন। আজ যে তার এই অবস্থা হবে, তখন তার মনে ছিল না। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। এখন তিনি ইতিহাসের ফল ভোগ করছেন। আগামীতে কিভাবে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায় সেজন্য সব দলের একসঙ্গে বসা উচিত বলে মন্তব্য করে এরশাদ বলেন, আসুন সবাই এক সঙ্গে বসি, কিভাবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায় সে ব্যাপারে আলোচনা করি।

নিজের শাসনামলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে এরশাদ বলেন, আমার সময়ে শ্রমবাজার চালু করেছিলাম। কিন্তু এখন শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। আমরা আবার ক্ষমতায় আসলে শ্রমবাজার চালু করব। তিনি বলেন, আমরা ছিলাম সংবিধান স্বীকৃত বৈধ সরকার। আমি দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা শুরু করেছি। দেশের মানুষ এখন যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলতে পারছে তার ভিত আমিই তৈরি করে দিয়েছি। এলজিইডি সৃষ্টি করে সব কাঁচা রাস্তা পাকা করার ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছি। এখন দেশে কোনো কাঁচা রাস্তা নেই।

এরশাদ আরও বলেন, আমি যমুনা সেতু করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এজন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে টাকা চেয়েছিলাম। তারা দেয়নি। পরে নিজস্ব উদ্যোগে সেতু করার জন্য আপনাদের কাছ থেকে সারচার্জ ধার্য করে ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছিলাম। পরবর্তী সরকারগুলো সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে এ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর আমিই প্রতিষ্ঠা করেছিলাম।

সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বলেন, ঢাকায় সাতটি ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করেছিল। ফলে রাষ্ট্রকে এজন্য জরিমানা দিতে হয়েছিল। কারণ, যারা কাজ শুরু করেছিল, হঠাৎ কাজ বন্ধ করে দেয়ায় হাইকোর্টে রিট করে। ফলে রাষ্ট্রকে ১৮ কোটি টাকা জরিমানা দিতে হয়েছিল। ওই ফ্লাইওভার হলে আজ ঢাকায় কোনো যানজট থাকত না।

বিএনপির সমালোচনা করে এরশাদ বলেন, দেশ ক্রিকেট, ফুটবল বা অন্য কোনো খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার বাংলাদেশকে পরপর চারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে। লজ্জা করে না আপনাদের? আপনারা আবার ক্ষমতায় আসতে চান? কোন মুখে আপনারা রাজনীতি করেন?
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হতো না, জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেয়ায় নির্বাচন হয়েছে। এরশাদ বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, ঘরে থাকলে খুন। এখন বাইরে গেলে গুম হতে হচ্ছে। প্রতিদিন খুন-গুম-অপহরণের ঘটনা ঘটছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস চলছে। ছাত্রদের হাতে কেন অস্ত্র আসবে?

এরশাদ বলেন, আমরা সরকারের ভালো কাজে সমর্থন দেব। সরকারের জনবিরোধী কাজের বিরোধিতা করে সংসদ ও রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলব। তিনি বলেন, আজকের সমাবেশের মধ্য দিয়ে আমরা প্রমাণ করেছি কোনো বাধাই মানি না। আমাদের লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া। এরশাদ আরও বলেন, আমাদের একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধ নেই। এক দল আরেক দলের শত্র“। আমরা শত্র“তা ভুলে গিয়ে নতুন পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই। সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আসুন হানাহানি-ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে অস্ত্রবাজি বন্ধ করি। কিভাবে আগামী দিনে নির্বাচন হবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেই। এছাড়া জাতির মুক্তি নেই। এভাবে দেশ চলতে পারে না। আজকের সমাবেশের মধ্য দিয়ে ২০১৫ সালে জাতীয় পার্টির দুঃসাহসিক যাত্রা শুরু হল। আমরা আর ভয় পাই না। আমরা সবাই বীর। জাতীয় পার্টি চায় সুশাসন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা। আমাদের লক্ষ্য আগামীতে ১৫১ আসন।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করায় তারেক রহমানের সমালোচনা করে এরশাদ বলেন, ‘এক যুবরাজ লন্ডনে বসে বলেন বঙ্গবন্ধু নাকি ‘রাজাকার’। এটা কোনো সুষ্ঠু রাজনীতি হতে পারে না। খালেদা জিয়া দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি চালু করেছিলেন একথা উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, আপনাদের সময়ে আমাকে সমাবেশ করতে দেননি। এখন নিজেরাই সমাবেশ করতে পারেন না। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, মনে রাখবেন ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। কোনো দিনও না। করবেও না।’

জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে এরশাদ বলেন, আমরা ২ মাস আগে মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। এরপরও তারা হরতাল ডেকেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহমর্মিতা নেই। এই চিন্তা-চেতনাকে আমি ঘৃণা করি। সব দলের প্রতি আবেদন আসুন একসঙ্গে বসি। আলোচনা করে শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ফিরিয়ে আনি। আমি সবচেয়ে সিনিয়র রাজনীতিবিদ। তাই আপনারা সব দল আসুন। দেশে শান্তি ফেরাতে ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে রূপরেখা তৈরি করি।

সরকারের সমালোচনা করে এরশাদ বলেন, ৬ বছরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৭২ জন খুন হয়েছে। অন্যান্য দলে ৭৪ জন। কিন্তু আমার সময়ে নূর হোসেনকে পরিকল্পিত হত্যা করা হয়েছিল। এখন দিনে কত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে এর হিসাব নেই। দেশের বিচার বিভাগ প্রশ্নবিদ্ধ। আমার প্রতি অবিচার করে, অন্যায়ভাবে জেলে পুরে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে বিএনপি প্রশ্নবিদ্ধ করে গেছে। এখন খালেদা জিয়াকে সেভাবে শাস্তি পেতে হচ্ছে। হলমার্ক, ডেসটিনি কেলেংকারিসহ বিদেশে ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, পাচার হওয়া অর্থের খবর নেই। ঘটনার বিচারও নেই। এখন শুনছি সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াবে। আমি বলি দাম না বাড়িয়ে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত এনে গ্যাস-বিদ্যুতে ভর্তুকি দিন। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে মানুষের ওপর অত্যাচার করলে রাজপথে আন্দোলন ও সংসদ থেকে ওয়াক আউট করব। গরিব মানুষকে কষ্ট দেবেন না।

দলে বিভক্তি দেখতে চাই না- রওশন এরশাদ : মহাসমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ এমপি বলেন, বারবার জাতীয় পার্টিতে বিভক্তির কারণে অনেক কর্মী বুঝতে পারেন না, কোথায় যাবেন। ফলে লাখ লাখ কর্মী বিভক্ত হয়েছেন। আমরা আর বিভক্তি চাই না। এক পার্টি দেখতে চাই। আমি উদাত্ত আহ্বান জানাব, আসুন আমরা মিলেমিশে কাজ করি। তিনি এ সময় অতীতে বিভিন্ন কারণে যারা দল ছেড়ে গেছেন তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণেরও দাবি জানান।

জাতীয় পার্টি ছাড়া পরিবর্তন আসবে না- আনিসুল ইসলাম : পানিসম্পদমন্ত্রী ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি বলেন, এ দেশে যেসব উন্নয়ন ও পরিবর্তন এসেছে তা জাতীয় পার্টি এনেছে। মানুষ আজ আবার পরিবর্তন দেখতে চায়। জাতীয় পার্টি ছাড়া পরিবর্তন আসবে না। তাই দেশের উন্নয়নের জন্য জাতীয় পার্টিকে আবারও ক্ষমতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দীর এ মহাসমাবেশ থেকেই নতুন কর্মসূচি পালনে সবাইকে আগামী চার বছর একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আগামী নির্বাচনে আমরা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করব ইনশাআল্লাহ। ক্ষমতায় গিয়ে বাংলাদেশের আমূল পরিবর্তন আনব।

সরকারের অপকর্মের দায় জাতীয় পার্টি নেবে না- অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম : সাবেক প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মহিলা পার্টির সভানেত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি বলেন, বর্তমান সরকারের অপকর্মের কোনো দায় জাতীয় পার্টি বহন করবে না। তিনি বলেন, তথাকথিত দুই বড় দলের কর্মকাণ্ডে জনগণ আজ অতিষ্ঠ। মানুষ এখন জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। সালমা ইসলাম বলেন, সারা দেশে আজ নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। যার ফলে দেশে সবকিছুর মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু মানুষের জীবনের মূল্য কমে গেছে। শেয়ারবাজার ও হলমার্কের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা লুটপাট করেছে সরকারি দলের নেতা ও তাদের দোসররা। সরকার ঋণের সুদের হার কমাচ্ছে না। উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংক ঋণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমেছে। নতুন বিনিয়োগের অভাবে শিল্প স্থাপন প্রায় বন্ধ। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বেকার যুব সমাজ জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অনৈতিক কাজে। এতে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এসব বিষয়ে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগের লাগামহীন দৌরাত্ম্যে মানুষ আজ অতিষ্ঠ। শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনা লক্ষ-কোটি মানুষের মনে আঘাত হেনেছে। সাগর ও রুনীর হত্যার বিচার এখনও জনগণ পায়নি। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার নায়ক নূর হোসেনকে এখনও ফিরিয়ে আনা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বেফাঁস কথাবার্তার কারণে জনগণের কাছে সরকার আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এসব ঘটনার দায়-দায়িত্ব সরকারকে বহন করতে হবে।

আওয়ামী লীগপ্রধানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশ নেয়ার কারণে আওয়ামী লীগ আজ ক্ষমতায়। এ জন্য জাতীয় পার্টি এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে মূল্যায়ন করুন। সেই সঙ্গে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে বলতে চাই, রাস্তায় জ্বালাও-পোড়াও করে, মানুষ মেরে আওয়ামী লীগের পতন ঘটানো যাবে না। আওয়ামী লীগের পতন ঘটাতে জাতীয় পার্টিকে লাগবে।

জনগণ আবার এরশাদকে ক্ষমতায় দেখতে চায় মন্তব্য করে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর আমাদের নেতা তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের কাছে। পরবর্তী সময়ে সাহাবুদ্দীন আহমেদ আমাদের নেতাকে জেলে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময় আমাদের নেতাকর্মীদের জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে। ইতিহাস একদিন এ অত্যাচারের বিচার করবে।

তিনি আরও বলেন, এরশাদ সরকারের আমলে তিনি পারিবারিক আদালত, পথকলি ট্রাস্ট এবং অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের বেতন মওকুফ ও শুক্রবার দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। মসজিদের পানি ও বিদ্যুৎ বিল মওকুফ, ভূমিহীনদের জন্য গুচ্ছগ্রাম করে এক যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। এসব উন্নয়নমূলক কাজ করাতে এরশাদ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কাছে স্বৈরাচার হয়ে গেলেন। মানুষ এখন বুঝতে পেরে এরশাদকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়। এ সময় তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন- আপনারা এরশাদকে ক্ষমতায় দেখতে চান কিনা? সমাবেশে উপস্থিত জনতা উচ্চস্বরে হাত তুলে ‘হ্যাঁ’ সূচক স্লোগান দেন।
জাতীয় পার্টির ৯ বছরের শাসনামলের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, এরশাদ সরকারের আমলে মানুষ শান্তিতে ছিল। তখন হত্যা, খুন, গুম, রাহাজানি, নারী নির্যাতন, ছিনতাই কিছুই ছিল না। কিন্তু আজ ঘর থেকে বের হলেই বাসায় ফিরতে পারবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই। বাবা-মা তদের সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে পথপানে তাকিয়ে থকেন তাদের সন্তানরা কখন বুকে ফিরে আসবে?
তিনি বলেন, পদ্মা-মেঘনায় আজ হাহাকার, রাখালিয়া বাঁশির সুর আজ স্তব্ধ, কোকিলের কুহু কুহু সুর আজ আর কানে ভেসে আসছে না, বাউল ফকিরেরা আজ ভাটিয়ালি সুর থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। এ অবস্থায় একটি দেশ চলতে পারে না।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, আজকের ঢাকা শহরকে এরশাদ আমলে তিলোত্তমা শহর ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি পৌর কর্পোরেশনকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তর করেছিলেন, পুরো ঢাকা শহরকে সোডিয়াম বাতি দিয়ে আলোকসজ্জা করেছিলেন। পরিচর্যার অভাবে আজ তা ধ্বংস হতে বসেছে। রোকেয়া সরণি, পান্থপথ, বিজয় সরণি, সর্ববৃহৎ ঢাকা রক্ষা বেড়িবাঁধ তারই কৃতিত্ব বহন করে আসছে। তিনি যখন চিন্তা করলেন ভবিষ্যতে ঢাকা শহর যানজটে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে, তখন তিনি ঢাকার তিন প্রান্ত সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালীতে তিনটি বাস টার্মিনাল নির্মাণ করলেন। যার সুফল আজ আমরা ভোগ করছি। স্বাধীনতা পরবর্তীতে আর কোনো সরকার এত বেশি উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারেনি।

সমাবেশে নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১ (নবাবগঞ্জ-দোহার) আসনের চিত্র তুলে ধরে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, গত নির্বাচনে শত প্রতিকূলতার মাঝেও দোহার-নবাবগঞ্জবাসী আমাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন। নির্বাচনের পরপরই পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে আমার প্রতিপক্ষ তিনজন মানুষকে হত্যা করেছেন এবং অনেক লোকের রক্ত ঝরিয়েছেন। মাত্র কয়েকদিন আগে দোহারে আমাদের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে হামলা হয়েছিল। সেই সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও তার দোসররা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ছিঁড়ে পদদলিত করেছে। আমি এই ন্যক্কারজনক ঘটনার বিচার দোহারবাসীর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।

মহাসমাবেশে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন-প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, মশিউর রহমান রাঙ্গা এমপি, মুজিবুল হক চুন্নু এমপি, ফখরুল ইমাম এমপি, নূর ই হাসনা চৌধুরী লিলি এমপি, গোলাম হাবিব দুলাল, গোলাম কিবরিয়া টিপু, একেএম মাইদুল ইসলাম এমপি, এমএ মান্নান, আবুল কাশেম, সুনীল শুভরায়, মীর আবদুস সবুর আসুদ, তাজ রহমান, আজম খান, ভাইস চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মৃধা এমপি, মাহজাবিন মোর্শেদ এমপি, নাসরিন জাহান রত্না এমপি, এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী, নুরুল আমিন সানু, সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। কেন্দ্রীয় ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে বক্তৃতা করেন- সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, জহিরুল ইসলাম জহির, লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি, আলমগীর শিকদার লোটন, শওকত চৌধুরী এমপি, গোলাম মোহাম্মদ রাজু, নুরুল ইসলাম নুরু, আরিফ খান, বাহাউদ্দীন বাবুল, হাজী আলাউদ্দিন প্রমুখ।