জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাংবাদিক সম্মেলন

 

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ 
এরশাদের সাংবাদিক সম্মেলন
চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়-
০৫ অক্টোবর, ২০১৫-সকাল ১১টা

 

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আস্সালামু আলাইকুম।

আপনাদের সবাইকে পবিত্র ঈদুল আযহা’র শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। এবার পবিত্র হজ্বের সময় মক্কায় ক্রেন ও মিনার দূর্ঘটনায় যে সমস্ত হাজীরা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি এবং তাদের শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা।

সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ-
জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মাননা “চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ” এবং আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের দেয়া আইসিটি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পুরুস্কার পাওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে জানাচ্ছি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। আমরা বিশ্বাস করি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা ও তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের ব্যাপক সফলতা অর্জন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ পুরুস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এতে বহিঃর্বিশ্বে বাংলাদেশের মুখ আরো উজ্জ্বল হবে। বাংলাদেশী হিসেবে তার এ পুরুস্কার পাওয়ায় আমরা আন্তরিকভাবে খুশি। প্রিয় বন্ধুগণ- আজকে বাংলাদেশে সন্ত্রাস, রাহাজানি, দলীয়করণ, টেন্ডারবাজি, সু-শাসনের অভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সমস্ত অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ,
আমরা গভীর উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, প্রতিনিয়ত দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বিশেষ করে ঈদুল আযহার আগে গরুর হাটে দলীয় লোকজনের চাঁদাবাজির কারণে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে দুইজন নিরীহ মানুষের নির্মম হত্যাকান্ড, ঈদের কয়েকদিন পরেই গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ায় একজন ইতালিয়ান নাগরিককে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সরকার আজ পর্যন্ত প্রকৃত হত্যকারীকে খুঁজে বের করতে পারেনি। এরপর গত শুক্রবারে গাইবান্ধায় একজন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মাতাল অবস্থায় একটি শিশুকে গুলি করে আহত করেছে। এ সরকারের আমলে শিশুরা যে নিরাপদ নয় তা আমরা ঈদের আগেও দেখেছি- রাকিব, রবিউল, রাজন হত্যার মধ্য দিয়ে। এমনকি মায়ের পেটে শিশু সুরাইয়া সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পাইনি। আমরা তখনও এইসব ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদ করেছিলাম, মানববন্ধন করেছিলাম, রাস্তায় বিক্ষোভ করেছিলাম। সরকারের কাছে দাবী জানিয়েছিলাম অবিলম্বে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। সাথে সাথে দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর জন্য আমরা জোরালো কন্ঠে দাবী জানিয়েছিলাম।

সরকার যে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারেনি, তারই জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে ঈদের পরে সংঘঠিত হত্যাকান্ডসমূহ। এমনকি গত ০৩ অক্টোবর রংপুরে দিনে-দুপুরে একজন জাপানী নাগরিককে হত্যা করা হয়েছেÑ যা সব গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কেবলমাত্র দেশের সাধারণ মানুষ নয়, বিদেশী নাগরিকরাও এদেশে নিরাপদ নয়! এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূতি বিনষ্ট হচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, দেশে সু-শাসনের অভাব ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে।

গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হচ্ছে- মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা, এটা যেকোনো সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। বর্তমান সরকার এই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতেও ব্যর্থ হয়েছে, অর্থাৎ দেশে কোনো সু-শাসন নাই। সু-শাসন ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন।

এমতাবস্থায়, দেশ এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। আমরা দেশের এই সংকটময় মুহুর্তে সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি সমস্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, দলীয় ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করা হোক এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা হোক। প্রশাসনকে দলীয় করণের এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বর্তমানে এই দুঃসহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা জানি, আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু দূর্ভাগজনক হলেও সত্য সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে পাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস শুরু হয়েছে। মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চায়, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে চায়, মতপ্রকাশ করতে চায়। কিন্তু সরকার মানুষের এই মৌলিক ও সাংবিধনিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

তাই আমরা দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে দাবী করছি, অবিলম্বে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করুন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য কোনো অতিরিক্ত বাজেটের প্রয়োজন হয়না। এরজন্য কেবলমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। দেশের সাধারণ মানুষ সহ বিদেশী নাগরিকদের জানমাল রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। দায়ী ব্যাক্তিরা যে দলেরই হোকনা কেনো তাদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। সাধারণ মানুষ স্বস্তি চায়, শান্তি চায়, বাঁচতে চায় এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে চায়। তাদের এই জন্মগত অধিকারগুলো নিশ্চিত করুন। অন্যথায় গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের পাতায়-ই সীমাবদ্ধ থাকবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ-
পবিত্র হজ্বের কার্যক্রম এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। হজ্ব শুরু হওয়ার পর আপনারা দেখেছেন হাজার হাজার হজ্ব যাত্রী যারা আল্লাহর মেহমান, হজ্বের অব্যবস্থার কারণে তারা হজ্ব করতে পারে নাই। বিষয়টি কারো কাম্য হতে পারেনা। ফিরতি পথে বিমানের শিডিউল বিপর্যয়ে আল্লাহর মেহমানরা আবারো নিদারুন কষ্ট করছে। আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাই- আগামীতে হজ্ব অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সরকার যেনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আমরা আল্লাহর মেহমানদের চোখের জল দেখতে চায়না।

প্রিয় বন্ধুগণ-
ইদানিং আমরা লক্ষ্য করছি দেশে সর্বস্তরের পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার একটি মহোৎসব শুরু হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কিছু কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজন এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত আছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। সম্প্রীতি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া জাতির জন্য দুঃখজনক। এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ছাত্ররা আন্দোলনে নেমেছে। জাতীয় পার্টি এই যৌক্তিক আন্দোলনের একমত পোষণ করে। সরকারকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সমস্ত প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় আগামীতে জাতি মেধাশূন্য হিসেবে পরিগণিত হবে।

সকল সাংবাদিকবৃন্দকে ধৈর্য্যসহকারে আমাদের বক্তব্য শোনার জন্য আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ..........আল্লাহ হাফেজ।

Last Updated (Monday, 05 October 2015 11:16)